২৬ মার্চ: স্বাধীনতা দিবসের ইতিহাস ও বাঙালি জাতির বীরত্বগাথা

 

২৬ মার্চ: বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা দিবসের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও গুরুত্ব


২৬ মার্চ: বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা দিবসের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও গুরুত্ব

ভূমিকা

২৬ মার্চ—বাঙালি জাতির জীবনে এক অবিনাশী দিন। শৃঙ্খল ভাঙার গান গাওয়ার দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দীর্ঘ দুই দশকের শোষণ, বঞ্চনা আর লাঞ্ছনার অবসান ঘটিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে নতুন এক দেশের অভ্যুদয় ঘোষণা করা হয়েছিল। ২৬ মার্চ কেবল একটি তারিখ নয়, এটি কোটি বাঙালির রক্তে কেনা এক সার্বভৌম পরিচয়ের নাম। আজ আমরা জানবো ২৬ মার্চের প্রেক্ষাপট, সেই কালো রাত এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সম্পূর্ণ ইতিহাস।

১. স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপট: দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস

​১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র গঠিত হয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হলেও তারা এক রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের ওপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালায়।

  • ভাষা আন্দোলন (১৯৫২): মাতৃভাষা বাংলার ওপর আঘাত হানার মাধ্যমেই বাঙালির মনে স্বাধীনতার বীজ রোপিত হয়।
  • সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য: পূর্ব পাকিস্তান থেকে অর্জিত রাজস্ব পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় করা হতো, অথচ উন্নয়নের ছোঁয়া এদেশবাসী পেত না।
  • ৭০-এর নির্বাচন: ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানি জান্তা সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে।

২. ২৫ মার্চের ‘অপারেশন সার্চলাইট’: সেই ভয়াল কালো রাত

​১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে যখন আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছিল, তখনই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালির কণ্ঠ স্তব্ধ করতে মেতে ওঠে ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞে। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নাম দিয়ে গভীর রাতে ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আধুনিক মারণাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসহ সারা দেশে নির্বিচারে গণহত্যা চালানো হয়। এই রাতটি বাঙালি জাতির ইতিহাসে ‘কালরাত’ হিসেবে পরিচিত।

৩. ২৬ মার্চের প্রথম প্রহর: স্বাধীনতার ঘোষণা

​হানাদার বাহিনীর আক্রমণ শুরু হওয়ার পরপরই অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে (রাত ১২টা ২০ মিনিট থেকে ১টার মধ্যে) জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। গ্রেফতার হওয়ার আগ মুহূর্তে তিনি ওয়্যারলেসের মাধ্যমে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরীর কাছে স্বাধীনতার বার্তা পাঠিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ঘোষণাটি ছিল:

​"ইহাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাইতেছি যে, যে যেখানে আছ, যাহার যা কিছু আছে, তাই নিয়া রুখিয়া দাঁড়াও। সর্বশক্তি দিয়া হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করো।"


​পরবর্তীতে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান এবং ২৭ মার্চ তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করেন। এই ঘোষণা সারা বাংলার ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের মাঝে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

৪. নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও বিজয়

​২৬ মার্চের সেই ঘোষণার পর থেকে শুরু হয় দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। বাংলার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে। ৯ মাস স্থায়ী এই যুদ্ধে ৩০ লক্ষ মানুষ শহিদ হন এবং ২ লক্ষ মা-বোন ইজ্জত হারান। ভারতসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অদম্য সাহসিকতায় ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। জন্ম নেয় স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।

৫. আজকের প্রেক্ষাপটে ২৬ মার্চের গুরুত্ব

​২৬ মার্চ আমাদের আত্মমর্যাদার প্রতীক। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি কখনো মাথা নত করেনি। বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশে ২৬ মার্চ পালনের গুরুত্ব অপরিসীম।

  • জাতীয় ঐক্য: এটি আমাদের রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে দেশ গড়ার কাজে ঐক্যবদ্ধ হতে অনুপ্রাণিত করে।
  • নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস জানানো: তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানাতে এই দিনের আলোচনা অত্যন্ত জরুরি।
  • সাফল্য উদযাপন: দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলাদেশ আজ যেখানে দাঁড়িয়ে, তার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ২৬ মার্চের সেই সাহসিকতায়।

উপসংহার

​২৬ মার্চ আমাদের শোক আর শক্তির সংমিশ্রণ। আমরা যাদের রক্তে এই স্বাধীনতা পেয়েছি, তাদের প্রতি চিরঋণী। আজ ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও শোষণমুক্ত একটি সোনার বাংলা গড়ে তোলা, যার স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

আরো বিস্তারিত দেখুন 

0 Comments

Post a Comment

Post a Comment (0)

Previous Post Next Post